১৩ই মে, ২০২১ ইং, ৩০শে বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম :

‘অকৃষি খাতে ঋণ দেয়ার জন্য সৃষ্টি হয়নি কৃষি ব্যাংকের’

কৃষিকাজ ডেস্ক»‘অকৃষি খাতে ঋণ দেয়ার জন্য সৃষ্টি হয়নি কৃষি ব্যাংকের’‘অকৃষি খাতে ঋণ দেয়ার জন্য সৃষ্টি হয়নি কৃষি ব্যাংকের’
এম এ ইউসুফ— ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের কর্মকর্তা হিসেবে ব্যাংকিং ক্যারিয়ার শুরু করেন। ২০১৪ সালের ২৯ অক্টোবর থেকে দায়িত্ব পালন করছেন ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের। কৃষি ব্যাংকসহ সামগ্রিক ব্যাংকিং খাত নিয়ে সম্প্রতি কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন হাছান আদনান।
৪৩ বছর পাড়ি দিয়েছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক। দীর্ঘ এ পথচলায় কৃষি ব্যাংকের সাফল্য কতটুকু?
আজ থেকে ৩৬ বছর আগে আমি কৃষি ব্যাংকে যোগ দিয়েছিলাম। তখন মাত্র কয়েকটি শাখা ছিল। এখন কৃষি ব্যাংকের শাখা হয়েছে রাজশাহী ও রংপুর বিভাগ বাদ দিয়ে ১ হাজার ৩১টি। রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের শাখাগুলো যোগ করলে আরো চারশর মতো হবে। এর অর্থ কৃষি ব্যাংকের দেড় হাজারের মতো শাখা গোটা দেশে কাজ করছে। কৃষি ব্যাংক কৃষি ও কৃষকের সেবায় নিয়োজিত। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এখন ব্যাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের ৩৬ লাখ ঋণগ্রহীতা রয়েছেন। ঋণের স্থিতি ১৮-১৯ হাজার কোটি টাকা। আমানতকারীর সংখ্যা ৭৫ লাখ। আমানতের স্থিতি ২১-২২ হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে কৃষি ব্যাংকে আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। দেশের কৃষকদের সেবা দেয়ার জন্য এর আনুষ্ঠানিক বা প্রাতিষ্ঠানিক বিস্তৃতি ঘটেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বার্ষিক কৃষিঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা দেয়া হয়। এ ঋণের ৬০ শতাংশের বেশি আমরা দিয়ে থাকি। প্রতি বছর আমরা আমাদের লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করি। এজন্য গত দুই বছর বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সম্মাননাও পেয়েছি। গত দুই বছরে আমাদের কৃষিঋণ বিতরণে যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে। কৃষিঋণ ছাড়া অন্যান্য ঋণও আমরা দিই। কয়েক দিন আগে পত্রিকায় এসেছে এসএমই ঋণ বিতরণে সরকারের সব ব্যাংকের মধ্যে একমাত্র কৃষি ব্যাংকের নাম রয়েছে সফলতার জন্য। এসএমইর জন্য আমরা একবার পুরস্কার পেয়েছি। এবারো আমরা আশাবাদী। গ্রামীণ অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে আমরা এসএমই ঋণ দিই। অর্থাৎ গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতেও আমরা ভূমিকা রাখছি। সেখানেও ৫০০ কোটি টাকার ওপর আমাদের এসএমই ঋণ রয়েছে। আমরা ৫ হাজার কোটি টাকা কৃষিঋণ বিতরণ করি। এ বছরের লক্ষ্য ৭ হাজার কোটি টাকা। বর্গাচাষীদের জন্য আমরা ক্রমান্বয়ে ঋণ বাড়িয়ে যাচ্ছি। প্রতি বছর ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা ১০ থেকে ২০ শতাংশ হারে বাড়ছে।
প্রান্তিক কৃষকদের জন্য কৃষি ব্যাংকের ভূমিকা কী?
কৃষি ব্যাংক সৃষ্টি হয়েছে কৃষি খাতে ঋণ বিতরণের জন্য। প্রায় ১৭ লাখ বর্গাচাষীকে কৃষিঋণ দেয়া হয়েছে। এ সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। আমরা চেষ্টা করছি সব কৃষকের কাছে তাদের চাহিদা অনুযায়ী কৃষিঋণ পৌঁছে দিতে।
অভিযোগ রয়েছে, কৃষকদের ঋণ না দিয়ে বাণিজ্যিক ঋণে ঝুঁকছে কৃষি ব্যাংক। এতে অনেক ক্ষেত্রে লোকসানেও পড়তে হয়েছে ব্যাংকটিকে। বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
কৃষি ব্যাংক কিছু বড় প্রতিষ্ঠানকে সাহায্য করেছে। এটাকে আমি বলব অকৃষি খাতে বিনিয়োগ। ২০১৪ সালে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক একটি নিষেধাজ্ঞা জারি করে, যাতে আমরা ওই ধরনের অকৃষি খাতে ঋণ বিতরণ না করি। এজন্য আমরা সেখান থেকে সরে এসেছি। কৃষি ব্যাংক আদেশের আওতাধীন যা রয়েছে, সেসব খাতে আমরা এখন ঋণ বিতরণ করছি। আমি দুই বছর ধরে কৃষিভিত্তিক শিল্পকে অগ্রাধিকার দেয়ার চেষ্টা করেছি।
কৃষি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ দিন দিন বাড়ছে, যার অধিকাংশই আমদানি ও রফতানি খাতে। খেলাপি ঋণ উদ্ধারে কৃষি ব্যাংকের উদ্যোগ কী?
২০১৪-১৫ সালে আদায় করা হয়েছে ৫ হাজার ৬৭৩ কোটি টাকা, ২০১৫-১৬ সালে আদায় হয়েছে ৫ হাজার ৩৬০ কোটি টাকা। এখানে কৃষিঋণের আদায় বেশি। অকৃষি ঋণ যা দেয়া হয়েছে, তা আদায় স্থবির হয়ে গেছে। কৃষক তো তার টাকা দিচ্ছেন। কমবেশি যা হোক দিচ্ছেন। কিছু ঋণ খেলাপি হচ্ছে আবার কিছু ঋণ আমরা ছাড় দিচ্ছি। বন্যায় ফসলের ক্ষতি হলে সময় বাড়িয়ে দেয়া হয়। এটাও তো আমাদের আদায়ের ওপর প্রভাব ফেলে। তাই সবকিছু বিবেচনা করে আমি মনে করি, আমরা যদি ৬ হাজার কোটি টাকা ঋণ দিই আর প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা আদায় করি, তাহলে এটি একটি বিরাট কাজ।
বড় ঋণ আদায়ের শেষ প্রচেষ্টা আদালতের দ্বারস্থ হওয়া। প্রতিষ্ঠানের যখন আর কোনো উপায় থাকে না, তখন মামলার দিকে যাই।
অভিযোগ রয়েছে, কৃষি ব্যাংকে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি সিন্ডিকেট রয়েছে, যাদের অনেকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। এ ব্যাপারে আপনার বক্তব্য কী?
আপনারা বাইরে থেকে যেভাবে দেখছেন, আমি ভেতর থেকে সে রকম দেখছি না। বাইরে কী অভিযোগ রয়েছে, সে ব্যাপারে আপনারা আমার চেয়ে বেশি ওয়াকিবহাল। যেকোনো প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন ধরনের মানুষ থাকে। কেউ ভুল করে ইচ্ছাকৃতভাবে আর কেউ অনিচ্ছাকৃতভাবে। ইচ্ছাকৃতভাবে অন্যায় করা মানুষ কৃষি ব্যাংকে থাকতে পারে। কাজের ভুল হতে পারে। কিন্তু দেখতে হবে, ভুলটা উদ্দেশ্যমূলক কিনা। আমরা বলি, বোনাফাইড ভুল না মেলাফাইড ভুল। কিছু মেলাফাইড ভুল দুই বছরে চিহ্নিত হয়েছে। এমনকি ১০-১২ বছর আগের চিহ্নিত ও শাস্তি প্রদানের যে কাজগুলো পেন্ডিং ছিল, তার অনেকগুলো সেটল করা হয়েছে। ১২৭টি বিভাগীয় মামলা নিষ্পত্তি করেছি দুই বছরে। স্থগিত মামলা ছিল, তার নিষ্পত্তি হয়েছে। এর সঙ্গে সাজাপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সংখ্যা প্রায় ২১৪, যার মধ্যে অবসরে যাওয়া কর্মকর্তাও রয়েছেন। এক ধরনের শৃঙ্খলাবোধ ব্যাংকের মধ্যে বিরাজ করছে বলে আমি মনে করি। দুষ্টের দমন, শিষ্টের পালন— এ ধারা দুই বছর ধরে খুব শক্তভাবে চালিয়েছি।
কৃষি ব্যাংকের এমডি হিসেবে আপনার সফলতা বা ব্যর্থতা…
আমি কৃষি ব্যাংকের কাঠামোগত উন্নয়নের চেষ্টা করেছি। কাঠামোয় পারিনি এখনো। অর্গানোগ্রাম ভাঙতে পারিনি, ভাঙার দরকার ছিল। এটা আমার ব্যর্থতার দিক বলতে পারি। তবে কর্মতত্পরতা আমি বাড়াতে পেরেছি। নিজ কাজের জন্য দায়বদ্ধতার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে সর্বত্র। যেকোনো শাখায় খোঁজ নিলে আমার বিশ্বাস যে সবাই বলবে, কৃষি ব্যাংকের কাজে ভিন্নতা এসেছে। এ ভিন্নতা আমি মনে করি আমার সফলতা। গত দুই বছরে লোকসান কমেছে। শৃঙ্খলা, ন্যায়নীতি মানা, নৈতিকতা সৃষ্টি হয়েছে দারুণভাবে। এটা ব্যাংকের লোকসান কমানোর ক্ষেত্রে সহায়ক হয়েছে বলে আমি মনে করি। যোগদানের পর আমি সর্বত্র সার্ভিলেন্স সিস্টেমের ওপর জোর দিয়েছি। টাইম অ্যাটেন্ডেস চালু করেছি। কর্মবিমুখতা দূর করেছি। দ্রুততার সঙ্গে অটোমেশন করছি। বর্তমানে ১৫২টি শাখা অনলাইনে রয়েছে, যেখানে আমি এসে পেয়েছিলাম ৯০টি। আমার পরিকল্পনা রয়েছে কৃষি ব্যাংকের সব শাখা অনলাইনের আওতায় আনার। এছাড়া আমি মোবাইল ব্যাংকিং চালু করেছি।
ব্যাংক কর্মকর্তারা দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ছেন। বিষয়টিকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
ব্যাংকিং খাতটা অনেক বড়। এখানে দুর্নীতি হতে পারে, তবে সে বিষয়ে আমার তেমন কিছু বলার নেই। আপনার মতো আমিও শুনেছি, দুর্নীতি হচ্ছে এবং অনেক সময় অনেক ব্যাংকার গ্রেফতার হচ্ছেন। দুর্নীতি কী আসলে? দুর্নীতি হলো আর্থিক সুবিধা ভোগ করা। ব্যাংকের কাজ হলো টাকা-পয়সা লেনদেন করা। এখন এ লেনদেনের মধ্যে কেউ কেউ নিজস্ব লেনদেন করছেন। তারা কাউকে ঋণ পাইয়ে দিতে খুচরা লেনদেন করছেন। দুই পক্ষই কিন্তু জড়িত। ব্যাংকার এখানে সুবিধা নিতে পারেন আবার যারা সেবা গ্রহণ করছেন, তারাও এখানে টাকা দিয়ে সুবিধা নিতে পারেন। কিন্তু ব্যাংকের কাজ তো টাকা দেয়া। এটা তো আমরা জানি। সেক্ষেত্রে কেউ সঠিকভাবে টাকা নিতে চাইলে ব্যাংক সেবা দিতে বাধ্য। অর্থাৎ সেবাগ্রহীতার মধ্যে যদি দুর্নীতির মনোবৃত্তি না থাকে, তাহলে ব্যাংকারের পক্ষে দুর্নীতি করা অসম্ভব।
ব্যাংকিং খাতের ঋণ কিছু ব্যবসায়ীর কাছে সীমাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। এটা খাতটিতে কী ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে বলে আপনি মনে করেন।
বলে রাখা ভালো, এ প্রশ্নের উত্তর আরো উচ্চপদস্থ কেউ দিলে ভালো হতো। তবে হ্যাঁ, ব্যাংকের কাজ ঋণ দেয়া। সেটা বড় প্রতিষ্ঠানকে দিতে হবে অর্থনীতির প্রয়োজনে। তবে যদি নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তা সীমাবদ্ধ হয়, তাহলে তা ঠিক নয়। এতে অসম বণ্টন হয়। পাকিস্তান আমলে ২২টি পরিবারের কাছে সম্পদ কুক্ষিগত ছিল। এ পরিবারগুলো ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের। তারা ব্যাংক থেকে টাকা তুলবে, পণ্য তৈরি করবে এবং সেটা আমাদের চড়া দামে কিনে ভোগ করতে হবে— এ রকম অবস্থা ছিল আমাদের।
বাংলাদেশ কিন্তু ছোট একটি দেশ। আমাদের দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে যেতে একদিনের বেশি লাগে না। এ রকম একটা দেশে বড় শিল্প দরকার আছে আবার ক্ষুদ্র শিল্পও দরকার আছে। কিন্তু এই বড় শিল্প তো অনেকে করবে না। কিছু লোক করবে। তারা যদি করতে পারে করুক। সেখানে আমাদের তো কোনো সমস্যা নেই। তারা শ্রমিক ব্যবহার করবে এখান থেকে। কিন্তু গ্রামীণ অর্থনীতিতে যদি ঋণ না যায়, তাহলে তারা তাদের ক্রেতা পাবে কোথায়? ক্রেতা পাওয়ার জন্য সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
একাত্তরের ২২ পরিবার নেই। এখন আমাদের এখানে জনসংখ্যা বেড়েছে। অর্থনীতি বড় হয়েছে। ধরলাম এখন কয়েক হাজার পরিবার এ রকম আছে। তারা ঋণ নেয়। কিন্তু ঋণের টাকা যথাযথভাবে ওই শিল্পে ব্যবহার হয়েছে কিনা, তা দেখতে হবে। অনেক সময় তো টাকা নিয়ে শিল্প-কারখানার কোনো খোঁজ থাকে না। টাকা দেশের বাইরে চলে যায়। এটা ভয়াবহ একটি দিক। এমনকি আপনি যদি অনৈতিক উপায়েও টাকা উপার্জন করেন, সেখানেও আমার সমস্যা নেই, যদি না সেটা বিদেশে চলে যায় এবং দেশের ভেতরেই বিনিয়োগ করা হয়।
ব্যাংকিং খাতের পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকাকে কীভাবে দেখেন?
প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ব্যাংক সব ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা। তাদেরও সীমাবদ্ধতা আছে। তাদের লোকবল সীমিত। কিন্তু এর মধ্যেও তারা তাদের পরিধি বৃদ্ধি করছে। আর্থিক খাতগুলোকে তাদের নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছে। কিন্তু সমস্যা বিশাল। সেটা সমাধানের জন্য তাদের প্রস্তুতি আছে কিনা, তা একটি প্রশ্ন হতে পারে।
নিয়ন্ত্রণ করা আর তদারক করার মধ্যে কিন্তু পার্থক্য আছে। খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়াই বাংলাদেশ ব্যাংকের জন্য একমাত্র উদ্বেগ নয়। খেলাপি ঋণ বাড়বে। কিন্তু ঋণগ্রহীতা ভালো আছে কিনা, সেটাও আপনাকে দেখতে হবে। এখন অন্যায়ভাবে ঋণ বেশি দিয়ে থাকলে বেশি খেলাপি হবে। স্বার্থ আদায়ে ঋণ দিলে সেটা তো ক্ষতিকর। এখানে কিন্তু ঋণ প্রদান প্রক্রিয়া ত্রুটিপূর্ণ; ব্যাংকিং খাত নয়। আবার ভালো ঋণ দিলেও তা আদায় হবে— এমন কথা কোথাও লেখা নেই। তবে সেখান থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ থাকে, যেটা প্রথমটায় থাকে না। এ বিষয়গুলো দেখতে হবে।
বাংলাদেশের খেলাপি ঋণ আদায়ের প্রক্রিয়া কী হতে পারে বলে আপনি মনে করেন?
কাজটা কে করবে— ব্যাংকার নাকি সরকার করবে, না অন্য কেউ? এটা করতে হলে কিন্তু সমাজের ক্ষমতাশালীদের সমর্থন লাগবে। উন্নত দেশে ক্ষমতাশালীরা সমর্থন দেয়। আমাদের দেশে কিন্তু নির্বাচনে একজন খেলাপি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারে না। বেশির ভাগ খেলাপি নির্বাচনের আগে টাকা দিয়ে কিংবা ঋণ পুনর্গঠন করে পার পেয়ে যান। সেটা তো ঠিক নয়। তবে হ্যাঁ, একবার আপনি এ সুযোগ পেতে পারেন। কিন্তু বারবার সে সুযোগ দেয়াটা অন্যায়।
আরো কিছু কথা আছে। যারা ঋণগ্রহীতা, তারা কিন্তু কোনো না কোনোভাবে আমাদের জিডিপিতে ভূমিকা রাখছে। তাদের বুঝতে হবে, দেশের প্রতি তাদেরও দায়িত্ব রয়েছে। মানুষের জন্য প্রচুর টাকা কিন্তু তৃপ্তির ব্যাঘাত ঘটায়। আমি শান্তির কথা না হয় না-ই বললাম। অভিজ্ঞতা থেকে আমি বলতে পারি, দু-একটি দেশ ভ্রমণ করে যেভাবে দেখেছি, যারা যত অংকের ঋণ নিক না কেন, তাদের সবসময় একটা লক্ষ্য থাকে নিজের দেশের জন্য কাজ করার। তাদের গৃহীত ঋণের টাকায় যেন সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়। আমাদের দেশের নাগরিকরাও হয়তো তা-ই চান। কিন্তু এখন অনেকেই টাকা সরিয়ে ফেলছেন আর সেটাই খেলাপির মূল কারণ। সেক্ষেত্রে আমার মনে হয়, মানসিকতায় পরিবর্তন আনতে হবে। এজন্য আমাদের কাজ করতে হবে। নির্বাচনে অংশ নিতে না দেয়া একটা ভালো দিক। এ রকম আরো অনেক উদ্যোগ নিতে হবে। যেমন— টেলিফোন সংযোগ না দেয়া, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ না দেয়া ইত্যাদি। শুধু ব্যাংকার একা এটা করতে পারবেন না। ব্যাংক ঋণ দিয়ে দিয়েছে। পরবর্তীতে তাদের নাগাল পাওয়া যায় না। অনেক সময় ভুয়া নামে ঋণ নিয়ে যায়। এ সমস্যাগুলোর সমাধান আমাদের একসঙ্গে করতে হবে।
কৃষি ব্যাংকের মূলধন ঘাটতির পরিমাণ প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা। এ টাকার সংস্থান কীভাবে হবে?
এখানে কৃষি ব্যাংকের একটা বদনাম হয়ে গেছে। বদনামটা কৃষি ব্যাংকের একার নয়, এটি একটি রাষ্ট্রীয় ব্যাংক। এটি শুধু ব্যাংক নয়, উন্নয়ন ব্যাংক। এ ব্যাংক গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে কাজ করবে। আমি সরকারের একটি বাড়ি একটি খামারে কাজ করেছি। এর ঋণগ্রহীতা যারা, তাদের কোনো সম্পদ নেই। এখন তারা আপনার কাছ থেকে ঋণ নিয়ে কীভাবে ফেরত দেবে। সেখানে একটি পরিকল্পনা তো দরকার হবে। আর যারা ঋণ ফেরত দিতে পারছে না, সেক্ষেত্রে আপনি কী করবেন। কেননা সরকার তো চাইছে তাদের জীবনমান উন্নয়ন করতে। এমন নয় যে, তাদের ঋণ দিয়ে কোনো উপকার হয়নি। প্রভূত উন্নয়ন হয়েছে। দেশের অর্থনীতিতে তাদের ভূমিকা অনেক বেশি। কৃষির উন্নয়ন হয়েছে।
আপনি মূলধন ঘাটতির কথা বলেছেন। আমি যৌক্তিকভাবে ঋণ দেব, কিন্তু যদি ভুয়া ঋণ দিয়ে থাকি অথবা ব্যাংকের কর্মকর্তারাই যদি টাকা গায়েব করে ফেলেন, তাহলে অন্য কথা। সেটা সরকারকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কিন্তু সঠিকভাবে টাকা দিয়ে যদি আপনি তা আদায় না করতে পারেন, তাহলে সেটা ব্যর্থতা নয়। কেননা এটি উন্নয়ন ব্যাংক এবং দেশের গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে আপনাকে তা মেনে নিতে হবে।
১০ টাকায় ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা নিয়ে কিছু বলুন।
আমরা এ কার্যক্রমে ৩৭ লাখ ৩৯ হাজার ৬১১টি অ্যাকাউন্ট খুলেছি। তারা ১০ টাকা জমা করে অ্যাকাউন্ট খুলেছে। এখন সেখানে কত টাকা হয়েছে, তা সহজেই অনুমেয়।
কৃষকের জন্য অন্য কোনো পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন কি?
গত অর্থবছরে রিভলভিং ক্রপ ক্রেডিট নামে নতুন একটি ঋণ প্রকল্প আমরা চালু করেছি। কৃষক সারা বছর লেনদেন করার সুযোগ পাবেন। টাকা ফেরত দেয়ার সুযোগ পাবেন। এটি চক্রাকার একটা পরিব্যবস্থা। আমরা সাফল্য পেয়েছি। এটা আমরা অন্যান্য ক্ষেত্রেও চালু করতে পারি। এটা নিয়ে কাজ চলছে। এছাড়া অটোমেশনের কাজ করছি। ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকার একটা অসমন্বিত হিসাব ছিল। সেটা এখন ৭ হাজার কোটি টাকায় নামিয়ে এনেছি। এ সাফল্য আমাদের দিতে হবে। আমরা জনবলের অভাবের মধ্যে এ কাজ করেছি। আমাদের লেনদেনের স্বচ্ছতার অভাব কতটুকু, তা পরিমাপ করতে পেরেছিলাম বলেই এটি সম্ভব হয়েছে।
দেশে কৃষির ভবিষ্যৎ কোন পথে?
কৃষির আধুনিকায়ন হয়েছে। হালের বলদ আর লাঙল দিয়ে কৃষিকাজ করা কৃষক অনেক কম। এখন যার পাওয়ার টিলার রয়েছে, সে সবার জমি চাষ করে দিচ্ছে। কৃষকের ছেলে কৃষক হবে, বিষয়টি এমন নয়। অনেক কৃষকের ছেলে অনেক বড় কর্মকর্তা আবার অনেক বড় কর্মকর্তার ছেলে এসে কৃষিকাজ করছে ও কৃষির উন্নয়নে ভূমিকা পালন করছে। কৃষিকাজ করতেও কিন্তু অভিজ্ঞতা লাগে।
কে কতটুকু কৃষিজমি চাষ করছে, বিদ্যমান কৃষিজমি চাষ করতে কতগুলো পাওয়ার টিলার লাগবে এবং সেটা আছে কিনা— এ পরিসংখ্যান এখনো করা হয়েছে বলে আমি জানি না। তবে পরিসংখ্যানটি থাকা দরকার। এটা নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে।
কৃষিজমি কমছে। কেউ বলছেন, কৃষির অবদান কমছে জিডিপিতে। কিন্তু জিডিপির আকার তো বড় হয়েছে আগের থেকে। জনসংখ্যা বেড়েছে। তার পরও আমরা কৃষিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ। সেক্ষেত্রে আমরা কিন্তু এগিয়েছি।
।। বণিক বার্তার সৌজন্যে

Share Button